অবিশ্বাসী কাঠগড়ায়

৳ 310.00

ড. হুমায়ূন আজাদ প্রথাগত প্রথাবিরোধিতার এক মূর্ত প্রতীক। বাঙ্গালী ‘মুক্ত’চিন্তকদের মাঝে মহীরুহসম হিসেবে গণ্য হূমায়ূন আজাদের চিন্তা কিংবা দর্শনের ক্ষেত্রে মৌলিক কোন অর্জন বা কৃতিত্ব নেই। তার ব্র্যান্ডের মুক্তচিন্তা হল ভাষার কারুকাজ আর আবেগী কথার আড়ালে উপযোগ আর ভোগবাদকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা। হুমায়ূন আজাদের অবিশ্বাস হল আবেগ, কাম ও ভাষাতাড়িত এক নাস্তিকতা, যার উদ্দেশ্য ‘যা খুশি তাই করার’ ইচ্ছাকে সম্মানজনক পোশাক পরানো – সব সীমা, নৈতিকতা ও অপরাধবোধ থেকে মুক্ত হয়ে ইন্দ্রিয়সুখের পেছনে ছুটে বেড়ানোর বিকারগ্রস্থ আত্মরতির আত্মপক্ষ সমর্থনের দুর্বল প্রচেষ্টা। তার জীবনদর্শন; যদি আদৌ একে জীবনদর্শন বলা যায় – পুরোটাই পশ্চিমাদের কাছ থেকে ধার করা। এবং ধার করা সে চিন্তাগুলোর উপস্থাপনাও অতিরঞ্জিত, অসংলগ্ন এবং অনেক ক্ষেত্রেই অশুদ্ধ।
.
স্রষ্টার অস্তিত্ব, মানব অস্তিত্ব ও চেতনার সূচনা, নৈতিকতা ও পরকালের মতো বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কোন প্রশ্নগুলোর বিজ্ঞান দিতে পারে আর কোনগুলো বিজ্ঞানের ও আওতার বাইরে পড়ে, সেটুকু বোঝার মত বিজ্ঞানের বুঝ ড. আজাদের ছিল না। আর এ প্রশ্নগুলোকে সৎ ভাবে মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় দার্শনিক বুঝ, উপলব্ধি কিংবা সততা কোনটাই তার লেখায় চোখে পড়ে না। ড. আজাদের লেখা থেকে ভাষার কারুকাজ ও সাহিত্যিক জিমন্যাস্টিক্স সরিয়ে মূল বক্তব্য ও দাবিগুলোর দিকে তাকালে গুণমুগ্ধ ব্যাক্তি ছাড়া বাকি সবার কাছে বিষয়টা পরিস্কার হয়ে যাবার কথা। সব অর্থেই ড. আজাদ ছিলেন একজন প্রথাগত প্রথাবিরোধি যার জীবনদর্শনের মূল স্তম্ভগুলো হল ইন্দ্রিয়সুখ, আত্মউপাসনা ও আত্মরতি।
.
তাই স্রষ্টা, ধর্ম, পরকাল, জীবনের উদ্দেশ্যের মতো মানুষের অস্তিত্বসমন্ধীয় প্রশ্নগুলোর বিতর্কে হুমায়ুন আজাদ বড়জোর একজন দ্বিতীয় শ্রেণীর নকলনবিশ। এক জলজ্যান্ত ক্লিশে। এমন কোন আলোচনা তার লেখায় আসেনি যা পশ্চিমাদের কাছ থেকে নকল করা না। এবং মজার বিষয় হল ড. আজাদ এসব ধার করা আলোচনার সবচেয়ে সরলীকৃত, সবচেয়ে স্থুল সংস্করনগুলোকে নিজের বৈপ্লবিক চিন্তা ও প্রথাবিরোধিতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এমন কোন কিছু তার লেখায় নেই যা এ বিষয়ে প্রাথমিক স্তরের পড়াশুনা করা মানুষের অজানা। তার যুক্তিতর্ক এবং সেগুলোর উপস্থাপনা এতোটাই দুর্বল যে ভাষার কারুকাজ বাদ দিলে পাঠকের এমন মনে হওয়া অস্বাভাবিক না যে কোন মধ্যবয়স্ক অ্যাকাডেমিক নন বরং এগুলোর লেখক কোন আত্মমুগ্ধ কিশোর। আরেকটু সদয় হলে হয়তো এ প্রসঙ্গে তার আলোচনাকে পশ্চিমা বিভিন্ন লেখক ও দার্শনিকদের রচনা থেকে বিক্ষিপ্ত বিশৃঙ্খলভাবে কুড়িয়ে নেয়া চিন্তা-শব্দের অতিসরলীকৃত সংকলন বলা যেতে পারে। তবে এমন সদয় আচরন ড. আজাদের প্রাপ্য কি না তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন থেকে যায়।
.
হুমায়ূন আজাদ এবং তার মতো অন্যান্যদের চিন্তা ও জীবনের বাস্তবতা আল-কুরআনে আল্লাহ ‘আয্‌যা ওয়া জাল আমাদের জন্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি বলেন ,

তুমি কি তাকে দেখনি, যে তার প্রবৃত্তিকে নিজের ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে? তবুও কি তুমি তার যিম্মাদার হবে? তুমি কি মনে কর যে, তাদের অধিকাংশ লোক শোনে অথবা বুঝে? তারা কেবল পশুদের মতো; বরং তারা আরো অধিক পথভ্রষ্ট। (তরজমা, সূরা আল ফুরক্বান, ৪৩-৪৪)

এবং তিনি বলেন,

তারা বলে, আমাদের পার্থিব জীবনই তো শেষ; আমরা মরি ও বাঁচি। মহাকালই আমাদেরকে ধ্বংস করে। তাদের কাছে এ ব্যাপারে কোন জ্ঞান নেই। তারা কেবল অনুমান করে কথা বলে। – [তরজমা, সূরা জাসিয়া: ২৪]
.
একথাগুলো উপলব্ধি করতে পারলে ড. হুমায়ূন আজাদ এবং তার মতো অন্যান্যদের দিয়ে আর কিছু বলার প্রয়োজন হয় না। তবে একটা প্রশ্ন থাকে – মৌলিকত্ব ও বিশেষত্বহীন ড. হুমায়ুন আজাদের রচনা নিয়ে বই লেখার কারন কী? প্রয়োজনই বা কী?
.
আমার মতে সারবস্তুর দিক দিয়ে মূল্যহীন হলেও ড. হূমায়ুন আজাদের চিন্তা ও লেখা বাংলাদেশের প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ সুশীল-বুদ্ধিজীবিদের বড় একটি অংশের চিন্তা ও চিন্তাগত দেউলিয়াত্বের প্রতিনিধিত্ব করে। নিজ কামনাবাসনা, খেয়ালখুশি ও অভ্যস্ততাকে জায়েজ করার জন্য ঔদ্ধত্য, তাচ্ছিল্য ও অজ্ঞতাভরে ব্রাহ্মণসুলভ উন্নাসিকতায় স্রষ্টা ও ধর্মের বিরুদ্ধে আবেগী তর্ক করে যাওয়া ড.হুমায়ুন আজাদকে এক অর্থে প্রগতিশীল, সংস্কৃতিমনা, সুশীল বাঙ্গাল নাস্তিকের আর্কেটাইপ (archetype) বলা চলে। মুক্তচিন্তার নামে অনলাইনে ইসলামকে গালাগালি করে চলা মুক্তমনাদের অনেকেই নিজেদের ভেতরে হূমায়ুন আজাদকে ধারণ করে। ইসলামবিদ্বেষের ধরন, কারন, প্রেরণা এবং মানের দিক থেকে এসব ব্লগার ও লেখকদের অনেককেই বলা যেতে পারে হুমায়ূন আজাদের মানসসন্তান।
.
বছরের পর বছর তারা পুনরাবৃত্তি করে যায় সেই একই ধরাবাঁধা কুযুক্তি, রেটরিক আর বুদ্ধিবৃত্তিক হাতসাফাইয়ের। তামাদি হয়ে যাওয়া মুখস্থ চিন্তা উগড়ে দিয়ে, নির্দেশিকা হুবহু অনুসরণ করে ধাপে ধাপে ‘প্রথাবিরোধী’ হয়ে ওঠার আপ্রান চেষ্টা চালায়। আর একারনেই নাস্তিকদের আইডল বনে যাওয়া এ মানুষটির চিন্তার দৈন্য, ভ্রান্তি ও অসংলগ্নতাকে তুলে ধরা দরকার। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া দরকার যাকে বিপ্লবী চিন্তাবিদ মনে করা অনুকরণ করা হচ্ছে, বেদীতে বসিয়ে ফুল দেয়া হচ্ছে, যার অনুকরণে প্রথাবিরোধি সাজা হচ্ছে, সে নিজে স্রোতে গা ভাসানো আত্মমুগ্ধ অনুকরণকারী ছাড়া আর কিছু ছিল না।

পাথরের মূর্তির মতো আদর্শিক মূর্তিগুলোও ভাঙ্গা দরকার। রাফান আহমেদ তার লেখায় এ কাজটি করেছেন। হুমায়ূন আজাদের মতো ভাষার কারিকুরি দিয়ে নিজের চিন্তাকে সত্য প্রমানে ব্যস্ত হননি, বরং প্রতিটি কথার পেছনে প্রয়োজনীয় তথ্য ও তথ্যসূত্র উপস্থাপন করেছেন। দর্শন ও বিজ্ঞানকে নিজ নিজ জায়গায় রেখে আলোকপাত করেছেন ড. আজাদ এবং তার মতো অন্যান্যদের যুক্তি, দাবি, সিদ্ধান্ত ও অনুসিদ্ধান্তগুলোর ওপর মৌলিক ভুলগুলোর ওপর।
.
অবিশ্বাসী কাঠগড়ায় – বইটি ‘নাস্তিকদের জবাব’ কিংবা ‘যুক্তিখণ্ডন’ হিসেবে সাজানো হয়নি। বরং নাস্তিকদের উপসংহারগুলোর ভ্রান্তি তুলে ধরার পাশাপাশি ড. আজাদের মতো মানুষদের মনস্তত্ব, চিন্তা প্রক্রিয়া, এবং এর অন্তর্নিহিত অসংলগ্নতার ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন। বইটিকে তাই ‘নাস্তিকতার জবাব’ এর বদলে বিজ্ঞান, দর্শন ও যুক্তির আলোকে প্রগতিশীল বাঙ্গাল সুশীলিয় নাস্তিকতা ও ইসলামবিদ্বেষের ব্যবচ্ছেদ বলা যেতে পারে। আমি ব্যাক্তিগতভাবে লেখকের এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই, এবং আশা করি অন্যান্য লেখকরাও ‘নাস্তিকতার জবাব’ এবং ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক লেখার গন্ডী থেকে বেড়িয়ে এসে ঐসব কাঠামো, মতাদর্শ ও সভ্যতার ব্যাপারে মনোযোগী হবেন যেগুলোর প্রভাবে একদিকে নাস্তিকতা কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার নামে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে ইসলামকে বিছিন্ন করার চিন্তা ও চেষ্টা বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যদিকে সমাজকে থেকে ইসলামী মূল্যবোধ, পরিবেশ আশংকাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
.
ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা প্রচার এবং বিশুদ্ধ তাওহিদের আহবানকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের ময়দানে নাস্তিকতা সবচেয়ে প্রকাশ্য শত্রু হলেও দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে ক্ষতিকর শত্রু না। বরং এর চেয়েও আরো ক্ষতিকর ও আগ্রাসী আদর্শিক শত্রু আমাদের অলক্ষেই হয়তো আমাদের ভেতর ঢুকে পড়েছে। আশা করি লেখকেরা এ সত্য উপলব্ধি করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করবেন এবং সচেষ্ট হবেনে মুসলিমদের মধ্যে ছড়িয়ে পরাজিত মানসিকতা ও মানসিক দাসত্ব থেকে উত্তরণের রূপরেখা স্পষ্ট করতে।

In stock

Category:
 

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “অবিশ্বাসী কাঠগড়ায়”

Your email address will not be published. Required fields are marked *